Latest Entries »

নাবিক জীবনটাকে অনেকে চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসাবে জানেন। । এবং সেই সাথে ভাল বেতন এবং দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবার আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের সাথে বেদনা, হতাশা এবং নিঃসঙ্গতার অংশ টা আমরা কেউ জানি না। অবশ্য বলতে পারেন আমরা অন্য কাউকে বুঝতে দেই না। অনেক সময় এমন ও হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ের সময় ও ফোন করে বলি “আমি ভাল আছি” । আজ পর্যন্ত যতবার আমি সোমালিয়ার বিপদজনক এলাকা পারি দিয়েছি আমার ছোট ভাই ছাড়া কাউকে বলি নি।

আমাদের মেরিনারদের একটা অনলাইন পত্রিকায় প্রাকাশিত একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীর লেখা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। লেখাটা উনি তার স্বামী যখন সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে আটক ছিলেন তখন তার ডাইরিতে লিখেছিলেন। পরে তিনি সবাইর সাথে শেয়ার করার জন্য পত্রিকায় দিয়েছিলেন।

“আমি চলছি তোমার দিগন্তে; তোমার পথেই আমার হেঁটে যাওয়া……………………..”
প্রিয় মাহির,
নিজেকে নিয়ে খুব বড়াই করা হোত আমার। সবাইকে বলে বেড়াতাম বিয়ের আগে প্রেম-টেম করা হবেনা। তারপর চলছিল দিনগুলো ঠিক আমি যেভাবে চেয়েছিলাম।। আনন্ত আর দৃষ্টির চুকে যাওয়া প্রেম দেখে অট্ট হাসি দিয়ে রুমাকে সাবধান করতে খুব ভাল লাগতো তখনো। বাংলা অগ্রায়হন মাসের এক ভেজা সন্ধ্যা। সারা দিন বৃষ্টি ছিল। তবু শীতের প্রস্তুতির চিহ্ন স্পষ্ট হয়েছে প্রকৃতির সবখানে। আমি বারান্দায় বসে বাইরের পৃথিবীর দিকে চেয়ে অপলক আছি। আমার থাকার ঘরটা দক্ষিনমুখী। আমি কবি নই। ছন্দ মেলানো আমার কাছে অসম্ভব ব্যাপার। সাহিত্য আমার কাছে চিরদিন দুর্বোধ্য। তবু আমি পড়ি। বিশেষ করে রবি ঠাকুরের বইয়ের সংগ্রহ আমার কাছে খুব বেশি। আমার হাতে সেদিন কবি গুরুর-ই একখানা বই ছিল। কি পড়ছো? অতি পরিচিত কন্ঠ শুনে বুকের ভেতর একটু কেমন যেন লেগে উঠল। পরে আবার মনে হলো প্রশ্নকর্তার জিজ্ঞাসা ত্রুটিপূর্ন। কারন হাতে বই থাকলেও স্পষ্ট বোঝা যায় আমার দৃষ্টি জানালার বাইরে। আত্ম-বিশ্বাসের সাথে তার ভুল ভাঙ্গাতে যেয়ে হোঁচট খেলাম। চেনা চেনা মুখ। ছেলেটা যেন কে…. মনে করার চেষ্টা করছিলাম। আমার মা তার পেছনে এসে বলল, চিনতে পারছিস না? আরে এতো তোর মাহির ভাইয়া। যখন ছোট ছিলি ওকে কত মেরেছিস মনে আছে? এখন সে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। জাহাজ চালিয়ে এদেশ ওদেশ যায়।
আমার মন ছুটে গেল স্মৃতির রাজ্যে। ফুফাতো ভাই মাহির বয়সে আমার বড়। তবু তার তোয়াক্বা না করে আমি প্রায় তার গায়ে হাত তুলতাম। ভয়ে সে আমাদের বাড়ি আসা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিল। এরপর অনেক বছর দেখা হয়নি। সেদিনের সেই বেকুবমুখো ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গেছে! আমার বিস্ময় কাটেনা। ছোট বেলায় আমার হাতে মারধর খাওয়া ছেলেটা এখন ব্যাপক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নৌ- প্রকৌশলী কর্মকর্তা! আমার হাসিও পাচ্ছিল। তবু এখন সে আমার অপরিচিত। আমি নিজেকে সহজ করতে পারছিলামনা। এদিকে মা চলে গেল তার কাজে। আমি বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। কি বলবো মাথায় আসছেনা। আমাকে সহজ করার দায়িত্বটা যেন মাহির(তুমি) নিয়ে নিল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, কি পড়ছিলে তুমি? রবীন্দ্রনাথ আমারো ভালো লাগে। আমি এখনো সময় পেলে পড়ি, আমারি মাথা নত করে দাওহে তোমার চরন ধুলার তলে, সকলি অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে……। আমি বুঝতে পারলাম, রবী ঠাকুরের সৃষ্টি নিয়ে তার পড়া-শোনা কম নয়। অনেক লম্বা কবিতা পুরোপুরি মুখস্থ। এ যুগের ছেলে মাহির। চাকুরী আর মেরিনের যন্ত্রপাতি ও নিয়ম কানুন নিয়ে অধ্যয়ন করার পড় যেটুকু সময় সে পায় তা কবিতা পড়ে নষ্ট করার কথা না। তার মত অনেকেইতো ফেইসবুক টেইসবুক নিয়ে অবসর সময়ের ব্যবচ্ছেদ করে। তাহলে সে কি কিছুটা ভিন্ন? কথা বলার পর বুঝলাম, না সেও এ যুগের ছেলেদের মত ভাবে, বুঝে তবে তার মতাদর্শ একটু আলাদা। আলোচনা আর অভিজ্ঞতার বর্ণায় মাহির দারুন ডানপিঠে। অন্যের প্রতি সম্মান রেখে নিজের চিন্তা ও চেতনার উপস্থাপন কিভাবে করতে হয় এ শিক্ষা যেন তার রক্তে মিশে আছে। আমি ঠিক মিলাতে পারছিলাম না। এ কি সেই বোকা-সোকা মাহির! আজ একজন ব্যক্তিত্ববান সুপুরুষ।
বিশ্বাস কর মাহির, সেদিন আমার আক্ষেপ হচ্ছিল খুব। ইস! যদি মাহির হয়ে জন্ম নিতাম। আক্ষেপ মানে ঠিক আমার নিজের কোন দূর্বলতা নয়। প্রকৃতির নৈপূণ্য দেখে এক অনন্ত জিজ্ঞাসা। স্রষ্টা সৃষ্টির মাঝে কখনো কখনো এত নিখুঁত পরিবর্তন নিয়ে আসেন আমরা নিজেকে ঠিক আর ধরে রাখতে পারিনা। নিজের অজান্তেই নিজেকে অর্পন করতে হয় কারো কাছে। আমার মনের ভেতর যতই ঝড় বইতে থাকুক না কেন স্বভাবসুলভ কঠিন আমি নিজেকে হঠাৎ করে বদলে নেবো তা কি করে হয়? আমার এখনো মনে পড়ে সেবার তুমি কয়েক দিন আমাদের সাথে কাটিয়েছ ঠিক তবু আমি নিজেকে সযত্নে তোমার বৃত্তের বাইরে রেখে দিলাম। আমার প্রিয় কেউ আছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে একদিন মন খারাপ করে চলে গেছ তুমি। এরপর সময় তোমাকে নিয়ে গেল আমাদের সীমা রেখার অনেক বাইরে। বহুদূরে। বিশ্বভ্রমন কর তুমি। তোমাকে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সারা দুনিয়ার বন্দরগুলো চষে বেড়াতে হয়। ওসব ভেবে মাঝে মাঝে ভাল লাগছিল। কেন? আমার কাছে উত্তর ছিলনা। তখন তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক তৈরী হয়নি তবু বুঝলাম আমি তোমাকে মিস করছি। জীবন হয়ত এমনই হয়। আমি তোমাকে অনুভব করি তবু আমি তোমার খবর নিতে যাবো কেন? তুমি আমার কে? এরকম কতত প্রশ্ন মনে আসত। এর মাঝে একদিন তুমি ফোন করে বসেছ। এরপর কত দিন…. আমার ভাল লাগতোনা। কে তুমি? আমাকে ফোন করবে কেন? তখন আমি জানতাম না ব্যয়বহুল স্যাটেলাইট ফোন কলের বিল কত হয়। তুমি ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করেছ স্যাটেলাইট ফোনের রিসিভার কানে রেখে শুধু আমি কেমন আছি তা জানার জন্য। আমার প্রিয় কেউ আছে কিনা। এ ভূতুড়ে প্রশ্নের কি উত্তর দিতে পারতাম আমি? আসলে আমারতো এমন কেউ ছিলনা। তবু আমার এটা বলতে অস্বস্তি লাগত। তাই কিছুই বলতাম না। অসম্ভব ধৈর্যশীল ছেলে তুমি মাঝে মাঝে বলতে, রীতা, আমি কিন্তু আটলান্টিকে ঝাপ দেবো। তুমি চুপ করে থাকছ কেনো?

একদিন আমি হাঁটছিলাম এক ধূসর বিবর্ণ পথে। একা একা পথ চলছি। হঠাৎ মনে হল কেউ একজন মিশে গেছে আমার ইচ্ছা, চেতনা, ভাল লাগা আর ভালবাসায়। অনেকদিন পর অনুভব করলাম আমি আর আমার একার নই। আমি কারো অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছি। খুব প্রত্যয়ী হয়ে নিজের মনের পাঠোদ্ধারও করে ফেললাম। হ্যাঁ..আমি, আমি মাহিরের হয়ে গেছি। নিজের ঐ সমর্পনকে সেদিন আর পরাজয় মনে হয়নি। অসাধারন এক ভাললাগার চাদরে যেন আচ্ছাদিত হলাম। মানলাম, আমি চলছি তোমার দিগন্তে; তোমার পথেই আমার হেঁটে যাওয়া। মাহির তোমার আবেশে আবিষ্ট আমি তখন পাগলপ্রায়। তোমাকে ছাড়া কিচ্ছু ভাবতে পারতাম না। এরপর থেকে তুমি ফোন না দিলে মনে হোত আমার চেয়ে দুঃখী পৃথিবীতে আর কেউ নেই। নিজের কষ্ট কখনো তোমার কাছে লুকাতাম না। প্রকাশ করতাম ভিন্নভাবে। জানি আমার বাড়াবাড়ি রকমের আবেগ মাঝে মাঝে তোমার প্রতি দুর্ব্যবহারের মত হয়ে যেত। অনেক ধৈর্য তোমার। তাই উহ্ শব্দটি পর্যন্ত করোনি। আমিওবা আর কি করতে পারতাম। তোমাকে ছাড়াতো আমার আর কিচ্ছু ভাল লাগেনা।

তুমি জাহাজে। সেবার একদম ইউরোপ চলে গেছ। তিন মাস পর ফিরবে এশিয়াতে। আমি দিন গুনে যায়।এক একটা দিন আমার কাছে বছরের মত লাগে। আর দুই মাস তের দিন পাঁচ ঘন্টা তিরিশ মিনিট বাকি। আমি অস্থির। প্রতীক্ষার প্রহর যেন পিষে ফেলছিলে আমাকে। আমি আর পারছিলাম না। ফোনে তোমাকে বললাম, বাবু, তুমি যদি আর দেরি কর আমাকে জীবীত পাবেনা। আমি আত্মহত্যা করে বসবো। আমার উম্মাদের মত কথা শুনে একেবারে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলে তুমি। একটু পরে আবার বলেছ, আমি তোমার কাছে আসছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসছি।
এর কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় আমি মার ঘরে শুয়েছিলাম বিকাল থেকে। কিচ্ছু ভাল লাগছিলনা। মা এসে বলল, রীতু দেখতো আমাদের মাহিরের মত কে আসছে। ও না দেশের বাইরে। আমি দেখার প্রয়োজন মনে করলাম না। মার বয়স হচ্ছে। ভুল হতে পারে। তাছাড়া তিন মাসতো তখনো পূর্ন হয়নি। আমি চোখ বন্ধ করে ভাবছি তোমার ফিরতে আর কত দিন কত ঘন্টা বাকি।
হঠাৎ তোমার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলাম। তুমি আমার পাশে বসে বলছ, রীতু, তুমি একটা মেয়ে! তোমার জন্য চাকরী ছেড়ে দিলাম।
আমি এবার উপদেশ দিতে শুরু করলাম, মাহির, নিজের এত বড় ক্ষতি তুমি কেন করেছ? আমার জন্য তোমার চাকুরী ছাড়া ঠিক হয়নি।
তুমি হাসতে হাসতে বলেছ, আগে তুমি এরপর চাকরী। তাছাড়া মেরিনারদের চাকরী নিয়ে ভাবতে হয়না। একটা চাকরী ছাড়লে এরকম আরো অনেকটা রেডি থাকে। সে যাইহোক, আমার কাছে এ চাকরীর চেয়ে তুমি বেশি গুরুত্বপূর্ন।
তোমার কথা শুনে সেদিন নিজেকে অসম্ভব ভাগ্যবতী মনে হলো। হাসি পাচ্ছিল এমন লক্ষী ছেলেটার গায়ে আমি ছোটবেলায় হাত তুলেছিলাম! একদম উচিত হয়নি।

এরপর কতগুলো দিন। তুমি, আমি আর আমাদের দুটো পরিবার। কি অসাধারন সম্পর্ক! সবার ইচ্ছা আমাদের বিয়ের পীড়িতে বসতে হবে। আর আমার ইচ্ছা ছিল, পড়াশুনা শেষ হোক তারপর বিয়ে। তোমার অকুন্ঠ সমর্থন আমার দিকে। আমি অনুপ্রানিত। জীবনের নতুন ছন্দে যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছি। আমার চেয়ে সুখী যেন দুনিয়ায় আর কেউ নেই।

প্রায় দেড় মাস আগের কথা। আমার ছোট্ট চাচাতো বোনের সাথে দুষ্টোমি করছিলাম আমি। আমাদের বসার ঘরে এসেছেন তোমার বাবা। আমার ফুফা বলে কথা। আমি কি আর কেয়ার করি? তবু মার পীড়াপীড়িতে তাকে সালাম করে এলাম। আমার ছোট বোন আমাকে শাড়ি পড়া নিয়ে ঠাট্টা করছিল। তোমার বাবা চলে যাবার আগে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, রীতা, মাগো মাহিরের জাহাজ মনে হয় হাইজ্যাক হয়েছে। তুমি চিন্তা কোরনা। আজকাল এরকম হয়। ইনশাআল্লাহ ছাড়া পেয়ে যাবে।

আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। তোমার নম্বরে কল করলাম। পাওয়ার কথা না তবুও। মেইল পাঠালাম। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিলাম। সবাই একই কথা বলল।
অপেক্ষার বিকল্প নেই। জলদস্যুরা একসময় যোগাযোগ করে মুক্তিপন চাইবে, সবাইকে বাসায় কথা বলার সুযোগ করে দেবে ইত্যাদি। এরপর থেকে আমি অপেক্ষা করছি। আমার সময় কাটেনা। আমার একটা দিন যেন একটা বছর। সময়তো পার হচ্ছেনা মাহির। আমি অপেক্ষা করছি তুমি কখন এসে বলবে, রীতু, তুমি একটা মেয়ে বটে! তোমার জন্য চাকরী ছেড়ে দিলাম।
আমি হয়ত বলবো, এ কেমন চাকরী করছ তুমি? আমার কাছ থেকে শুধু দূরে থাকতে হয়। এ চাকরী না করলে কি নয়?
আর তখন তুমি হাসতে হাসতে বলবে, আরে…মেরিনারদের জন্য দূরত্ব কোন ব্যাপারইনা। দেখছোনা তোমাকে সারা দুনিয়া থেকে ফোন করে বেড়াচ্ছি। সব দেশ-মহাদেশ, সাগর-মহা সাগর ঘিরেইতো মেরিনারদের বাড়ি। তাছাড়া মেরিনারদের সবাই যদি চাকরী ছেড়ে দেয় তাহলে জাহাজের প্রপেলারতো ঘুরবেনা ম্যাডাম। আর জাহাজের প্রপেলার না ঘুরলে জাহাজে বাণিজ্য হবেনা; সারা দুনিয়াতো অচল হয়ে যাবে সোনা।
আমার অবুঝ মন। তার যুক্তি, সারা দুনিয়ার দায়িত্ব তোমাকে কে দিয়েছে বাপু? তুমি ওসবে না গেলে কি নয়? মার্চেন্ট জাহাজ চালাকনা অন্যরা। তুমি শুধু আমার কাছাকাছি থাকো।
এরপর তোমার আগের যুক্তিগুলো তুমি আবার দেবে, দূরে থাকলে ভালোবাসা বাড়ে। কাছে যাবার জন্য মন পাগল হয়, অস্থির হয়। এরপর কাছে এলে মনে হয় স্বর্গ বুঝি পৃথিবীতে নেমে এসেছে। এরকম আরো কত অদ্ভুত যুক্তি।

আমার কাছে এক সময় তোমার সব যুক্তি আগের মতই অকাট্য হয়ে ঠেকবে। আমি আর দ্বিমত করতে পারবোনা। আমার সান্ত্বনা তোমাকে বললেতো তুমি যখন তখন ছুটে আসো, আসতে পার। তুমি আমাকে প্রতি মূহুর্তে আমাকে ফোন কর; বুঝতে দাওনা তুমি আমার কাছ থেকে দূরে কোথাও আছো।
আমার প্রিয় মাহির, আজ কতগুলো দিন তুমি আমাকে ফোন দিচ্ছনা। কেমন যাচ্ছে তোমার সময়? কেমন আছো তুমি? আমি ভালো নেই। আমার কিচ্ছু ভালো লাগেনা। আমি আর পারছিনা। তুমি ফিরে আসো।

ইতি-
তোমারই রীতা

সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ে একটা সিরিজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু অলসতার কারনে আর লেখা হয়ে উঠে নি। ভাবছি আবার কিছু লিখব যদি অলসতা অনুমতি দেয়।

Advertisements

১৯৯১ সাল । আজিমপুরে প্রাইভেট পড়তে এক স্যারের বাসায় বসে আছি আমারা ৬ বন্ধু । এমন সময় স্যারের এক বন্ধু আসল। স্যার নেই তাই আমাদের সাথেই গল্প শুরু করলেন। প্রথমে একটু দূরত্ব বজায় রাখলেও এক সময় তার আন্তরিকতা , সৌজন্যতা বোধের কারনে অল্প সময়ে আমাদের আপন করে নিয়েছিলেন। প্রায়ই তাকে স্যারের বাসায় দেখতাম। এবং আমরা সবাই তার ভক্ত হয়ে গেলাম। অনেক দিন পর জেনে ছিলাম ব্যাক্তিটি ছিল ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ।

ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার হয় নি এবং কোন কালেও হবে না।তিনি ছিলেন এদেশের একজন মেধাবী বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন সত্যিকারের বিশ্বাসী । ক্ষমতার ভিতর থেকেও কখনও ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম সুযোগ নেননি। যা তাঁর জন্য খুব সহজ ছিলো। তিনি আপন অবস্থানে থেকেই কাজ করে গেছেন।তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদুৎ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হলো, তিনি তার ইচ্ছার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরনীয়।

আমি অনেকটা আশা নিয়ে ব্লগে এসেছিলাম তার মৃত্যু বার্ষিকীতে ব্লগে কেউ না কেউ তাকে নিয়ে পোস্ট দিবেন। হয়ত মান সম্পন্ন পোস্ট হলে স্তিকি হবে। কিন্তু যতদুর আমার নজর পড়েছে এরকম কোন পোস্ট পেলাম না। এটা সত্যিই দুঃখ জনক । আমরা রাজনীতির বাইরে কোন চিন্তা করতে পারি না। সব কিছুর ভিতরে রাজনীতি খুঁজি। এবং নিজের দেশের গুণী জনকে সম্মান দিতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করার যে প্রস্তুতি নেয়া হল তার কানাকড়িও দেখলাম না এই গুণী জনের জন্য। আমারা আমাদের নোবেল লরেটকে বলি “রাবিশ” আর বিদেশ থেকে নোবেল বিজয়ী নিয়ে আসি সম্মান দেখানর জন্য।

আসুন আমরা আমাদের দেশের এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসি করেন।

ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া সংক্ষিপ্ত জীবনী

জন্ম : ১৬ ফেব্রুয়ারী, ১৯৪২ খ্রিঃ।
মৃত্যু : ০৯ মে, ২০০৯ খ্রিঃ।

বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ট ড: এম এ ওয়াজেদ মিয়া ওরফে সুধা মিয়া। তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজশাহী বিজ্ঞান কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতঃ ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তিনি তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের ডিপ্লোমা অফ ইমপেরিয়াল কলেজ কোর্স কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাকে উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৯৬৯ সালে ইতালি ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এ সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস করে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোষ্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগষ্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি অনেক জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সম্মেলনে যোগদান করেছেন।

তার অনেক গবেষণামূলক ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত চারটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে : (1) Fundamentals of Thermodynamics, (2) Fundamentals of Electromagnatics, (৩) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, (৪) বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারী চালচিত্র। তাঁর এসব গ্রন্থ
নিজস্ব স্বকীয়তায় উজ্জ্বল।। তাঁর Fundamentals of Electromagnatics গ্রন্থটি ভারতে পাঠ্য বই হিসাবে ছিল এবং ইংল্যান্ডেও বহুল পঠিত একটি বই।

মরহুম ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া দীর্ঘদিন যাবত দেশের আনবিক শক্তি বিষয়ক গবেষণায় অবদান রেখেছেন, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রকে গড়ে তুলেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগের ছাত্রদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাংলাদেশের আনবিক শক্তি বিজ্ঞান গবেষণায় তাঁকে একজন পথিকৃৎ বলা যায়।

২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ০৯ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

Welcome to WordPress.com! This is your very first post. Click the Edit link to modify or delete it, or start a new post. If you like, use this post to tell readers why you started this blog and what you plan to do with it.

Happy blogging!