১৯৯১ সাল । আজিমপুরে প্রাইভেট পড়তে এক স্যারের বাসায় বসে আছি আমারা ৬ বন্ধু । এমন সময় স্যারের এক বন্ধু আসল। স্যার নেই তাই আমাদের সাথেই গল্প শুরু করলেন। প্রথমে একটু দূরত্ব বজায় রাখলেও এক সময় তার আন্তরিকতা , সৌজন্যতা বোধের কারনে অল্প সময়ে আমাদের আপন করে নিয়েছিলেন। প্রায়ই তাকে স্যারের বাসায় দেখতাম। এবং আমরা সবাই তার ভক্ত হয়ে গেলাম। অনেক দিন পর জেনে ছিলাম ব্যাক্তিটি ছিল ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ।

ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার হয় নি এবং কোন কালেও হবে না।তিনি ছিলেন এদেশের একজন মেধাবী বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন সত্যিকারের বিশ্বাসী । ক্ষমতার ভিতর থেকেও কখনও ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম সুযোগ নেননি। যা তাঁর জন্য খুব সহজ ছিলো। তিনি আপন অবস্থানে থেকেই কাজ করে গেছেন।তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদুৎ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হলো, তিনি তার ইচ্ছার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরনীয়।

আমি অনেকটা আশা নিয়ে ব্লগে এসেছিলাম তার মৃত্যু বার্ষিকীতে ব্লগে কেউ না কেউ তাকে নিয়ে পোস্ট দিবেন। হয়ত মান সম্পন্ন পোস্ট হলে স্তিকি হবে। কিন্তু যতদুর আমার নজর পড়েছে এরকম কোন পোস্ট পেলাম না। এটা সত্যিই দুঃখ জনক । আমরা রাজনীতির বাইরে কোন চিন্তা করতে পারি না। সব কিছুর ভিতরে রাজনীতি খুঁজি। এবং নিজের দেশের গুণী জনকে সম্মান দিতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করার যে প্রস্তুতি নেয়া হল তার কানাকড়িও দেখলাম না এই গুণী জনের জন্য। আমারা আমাদের নোবেল লরেটকে বলি “রাবিশ” আর বিদেশ থেকে নোবেল বিজয়ী নিয়ে আসি সম্মান দেখানর জন্য।

আসুন আমরা আমাদের দেশের এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসি করেন।

ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া সংক্ষিপ্ত জীবনী

জন্ম : ১৬ ফেব্রুয়ারী, ১৯৪২ খ্রিঃ।
মৃত্যু : ০৯ মে, ২০০৯ খ্রিঃ।

বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ট ড: এম এ ওয়াজেদ মিয়া ওরফে সুধা মিয়া। তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজশাহী বিজ্ঞান কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতঃ ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তিনি তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের ডিপ্লোমা অফ ইমপেরিয়াল কলেজ কোর্স কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাকে উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৯৬৯ সালে ইতালি ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এ সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস করে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোষ্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগষ্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি অনেক জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সম্মেলনে যোগদান করেছেন।

তার অনেক গবেষণামূলক ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত চারটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে : (1) Fundamentals of Thermodynamics, (2) Fundamentals of Electromagnatics, (৩) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, (৪) বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারী চালচিত্র। তাঁর এসব গ্রন্থ
নিজস্ব স্বকীয়তায় উজ্জ্বল।। তাঁর Fundamentals of Electromagnatics গ্রন্থটি ভারতে পাঠ্য বই হিসাবে ছিল এবং ইংল্যান্ডেও বহুল পঠিত একটি বই।

মরহুম ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া দীর্ঘদিন যাবত দেশের আনবিক শক্তি বিষয়ক গবেষণায় অবদান রেখেছেন, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রকে গড়ে তুলেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগের ছাত্রদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাংলাদেশের আনবিক শক্তি বিজ্ঞান গবেষণায় তাঁকে একজন পথিকৃৎ বলা যায়।

২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ০৯ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

Advertisements